বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জীবনে নানা সংকট নতুন কিছু নয়। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অর্থনৈতিক চাপ মিলিয়ে যখন একজন তরুণ উদ্যোক্তার পুরো জীবন ভেঙে পড়ে, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থাকে না—বরং হয়ে ওঠে সমাজের কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ঠিক তেমনই এক গল্প রাজধানীর মহাখালীর তরুণ উদ্যোক্তা মোঃ জাহিদ হাসানের।
মহাখালীর আইপিএস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক ছাত্র জাহিদ হাসান ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন বড় ব্যবসায়ী হওয়ার। ক্লাস এইটে পড়ার সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি Ziaur Rahman-কে নিয়ে একটি গল্প পড়ে রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই গড়ে ওঠে দেশপ্রেম, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় স্বপ্ন।
শুধু রাজনীতি নয়, ব্যবসার প্রতিও ছিল তার প্রবল আগ্রহ। সে কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে কমার্স বিভাগে পড়াশোনা করেন তিনি। নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করার স্বপ্ন ছিল তার।
২০২১ সালে সীমিত পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন জাহিদ। নিজের সঞ্চয়, আত্মীয়-স্বজনের সহায়তা এবং পরিচিত মানুষের বিশ্বাসকে ভিত্তি করেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু করোনা মহামারির ধাক্কায় ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। এর মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। বাড়তে থাকে ডলারের দাম ও আমদানি খরচ।
এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তিনি কয়েকজনের কাছ থেকে ঋণ নেন এবং এসএমই লোন সংগ্রহ করেন। পরে চীন থেকে “Textured Yarn” নামের একটি পণ্য আমদানি করেন নতুনভাবে ব্যবসা দাঁড় করানোর আশায়।
কিন্তু পণ্য দেশে পৌঁছানোর পরই শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। জাহিদের অভিযোগ, একটি ইংরেজি শব্দের বানানকে কেন্দ্র করে কিছু কাস্টমস কর্মকর্তা তাকে দীর্ঘদিন হয়রানি করেন। প্রায় তিন মাস ধরে নানা জটিলতা ও চাপের মধ্যে রাখা হয় তাকে। তার দাবি, প্রায় ৪৫ লাখ টাকার পণ্য পরবর্তীতে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার জরিমানা ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যায়।
এখানেই শেষ নয়। জাহিদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার মোবাইল ফোনে Khaleda Zia-এর ছবি ও পোস্টার থাকায় তাকে বিএনপি-সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় ভয়ভীতি, মানসিক চাপ এবং রাজনৈতিক হয়রানির ঘটনা।
তরুণ উদ্যোক্তা জাহিদ হাসান বলেন,
“আমি একজন সাধারণ ব্যবসায়ী ছিলাম। স্বপ্ন ছিল দেশের জন্য কিছু করব। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আমাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।”
বর্তমানে তিনি চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। ব্যাংক ঋণ, পাওনাদারের চাপ এবং ব্যবসার মূলধন হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জানান। এমনকি সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালানোও এখন তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার জন্য রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
জাহিদ হাসানের গল্প আজ শুধুই একজন মানুষের নয়। এটি বাংলাদেশের বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার প্রতিচ্ছবি, যারা অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক হয়রানির কারণে তাদের স্বপ্ন হারিয়ে ফেলছেন প্রতিনিয়ত।