চট্টগ্রামে অগ্রণী ব্যাংকের ভল্ট থেকে সাড়ে ৪ কোটি টাকা উধাও, গ্রেপ্তার ২

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ
চট্টগ্রামে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির একটি শাখার ক্যাশ ভল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা উধাও হওয়ার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যাংকের ক্যাশ ইনচার্জ সিনিয়র অফিসার কামরুল ইসলাম (৪১) এবং তার পরিচিত জাফর উল্লাহ তানভীর (২৫) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি জেলা পরিষদ ভবনে অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংকের লালদীঘি পূর্ব পাড়স্থ করপোরেট শাখায় এই ঘটনা ঘটেছে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকের নিয়মিত হিসাব মেলানোর সময় ভল্টে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকার ঘাটতি ধরা পড়ে।
বান্ডেলের ভেতরে ছোট নোট রাখার অভিযোগ
পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, ভল্টে রাখা এক হাজার টাকার নোটের বান্ডেলের ভেতরে ১০০ টাকা বা অন্য ছোট মূল্যমানের নোট রাখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। বাইরে থেকে বান্ডেল ঠিক থাকলেও ভেতরে এক হাজার টাকার নোটের পরিবর্তে কম মূল্যমানের নোট থাকত।
অভিযোগ অনুযায়ী, এভাবে কাগজপত্র ও হিসাব ব্যবস্থায় বান্ডেলগুলোকে এক হাজার টাকার নোটের বান্ডেল হিসেবে দেখানো হতো। ফলে হিসাবের সঙ্গে বাস্তবে থাকা টাকার পরিমাণের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে অর্থের ঘাটতি তৈরি করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি
মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১ জুন থেকে চলতি বছরের ৯ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে এই পদ্ধতিতে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটতে পারে। গত ৯ আগস্ট ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রম শেষে ভল্টের নগদ টাকা হিসাব করার সময় ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি ধরা পড়ে।
ঘাটতির বিষয়টি জানার পর ভল্টের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা কামরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তিনি সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার কাছে টাকার হিসাব জানতে চাইলে তিনি গড়িমসি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশি তদন্তে উঠে আসছে নতুন তথ্য
কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইকবাল হোসেন জানান, ব্যাংকের ভল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত সোমবার থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলায় ভল্টের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র অফিসার কামরুল ইসলামকে প্রধানভাবে দায়ী করা হয়েছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কামরুল ইসলামসহ দুজনকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করলে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ হাটহাজারী উপজেলার একটি গরুর খামারে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ‘ইশরাত অ্যাগ্রো’ নামে ওই খামারে বিভিন্ন জাতের প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে বলে জানা গেছে। খামারটির সঙ্গে জাফর উল্লাহ তানভীরের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
তবে আত্মসাৎ করা অর্থের পুরোটা কোথায় গেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অর্থের লেনদেন, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।
ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রশ্ন
রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের ভল্টে কয়েক কোটি টাকার ঘাটতি কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে ধরা পড়েনি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নগদ টাকা সংরক্ষণ, বান্ডেল যাচাই, দৈনিক হিসাব মেলানো এবং ভল্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
হাজার টাকার নোটের বান্ডেলের মধ্যে ছোট নোট রেখে হিসাব মেলানোর অভিযোগ সত্য হলে, নিয়মিত ভল্ট পরিদর্শন ও নগদ টাকা যাচাইয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
গ্রাহকদের মধ্যেও উদ্বেগ
ভল্টে থাকা অর্থ বিভিন্ন গ্রাহকের আমানতের বলে জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ উধাও হওয়ার ঘটনায় গ্রাহকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, মামলাটি তদন্তাধীন। ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, ব্যাংকের অন্য কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সহযোগিতা ছিল কি না এবং আত্মসাৎ করা অর্থের কতটা উদ্ধার করা সম্ভব—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত শেষ হলে অগ্রণী ব্যাংকের ভল্ট থেকে অর্থ উধাওয়ের প্রকৃত ঘটনা, অর্থ আত্মসাতের পদ্ধতি এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও তথ্য জানা যেতে পারে।








