বাংলাদেশ , বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ খবর :
সর্বাধিক পঠিত

চট্টগ্রামে বন্যায় কমিউনিটি ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত, স্বাস্থ্যসেবায় চরম সংকট

চট্টগ্রামে বন্যা ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে এনেছে জেলার স্বাস্থ্যখাতে। সাম্প্রতিক বন্যায় শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে গ্রামের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম জেলায় মোট ৫২৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক অনুমোদিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫১৪টি চালু ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় জেলার ৮১টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলায়, যেখানে ৩১টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বাঁশখালীতে ১৬টি এবং আনোয়ারা, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি, সন্দ্বীপ, রাউজান, সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানিতে অনেক ক্লিনিকের মেঝে ও দেয়াল নষ্ট হয়েছে। কয়েকটি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানির পাম্প, পানির ফিল্টার, টয়লেট এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জায়গায় নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে পড়েছে। এসব কারণে চিকিৎসাকর্মীরা নিরাপদভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৫০টি কমিউনিটি ক্লিনিক নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। অন্যগুলো দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। একই সঙ্গে সাতকানিয়া ও আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও বন্যার কারণে আইপিএস, জেনারেটর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে।

কমিউনিটি ক্লিনিকে সাধারণত প্রাথমিক চিকিৎসা, গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। এসব সেবা বন্ধ বা সীমিত হয়ে যাওয়ায় গ্রামীণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।

এদিকে, চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি সরকারি ওষুধ সরবরাহেও দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ওষুধ সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে অনেক রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ সময়মতো পাচ্ছেন না।

আগে কমিউনিটি ক্লিনিকে ২৭ ধরনের ওষুধ দেওয়া হলেও বর্তমানে ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। সম্প্রতি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ যুক্ত করা হলেও সরবরাহ সংকটের কারণে রোগীরা সেই সুবিধাও নিয়মিত পাচ্ছেন না।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকৌশল বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কিছু সময় লাগবে। তবে ধাপে ধাপে সংস্কার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মোবাইল মেডিকেল টিম ও অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটও বিতরণ করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কমিউনিটি ক্লিনিক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা না হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা স্বাভাবিক করা কঠিন হবে।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক সম্পর্কিত তথ্য
আপডেটের সময় : ০১:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
৫৮ সময় দৃশ্য

চট্টগ্রামে বন্যায় কমিউনিটি ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত, স্বাস্থ্যসেবায় চরম সংকট

আপডেটের সময় : ০১:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামে বন্যা ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে এনেছে জেলার স্বাস্থ্যখাতে। সাম্প্রতিক বন্যায় শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে গ্রামের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম জেলায় মোট ৫২৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক অনুমোদিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫১৪টি চালু ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় জেলার ৮১টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলায়, যেখানে ৩১টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বাঁশখালীতে ১৬টি এবং আনোয়ারা, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি, সন্দ্বীপ, রাউজান, সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানিতে অনেক ক্লিনিকের মেঝে ও দেয়াল নষ্ট হয়েছে। কয়েকটি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানির পাম্প, পানির ফিল্টার, টয়লেট এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জায়গায় নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে পড়েছে। এসব কারণে চিকিৎসাকর্মীরা নিরাপদভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৫০টি কমিউনিটি ক্লিনিক নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। অন্যগুলো দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। একই সঙ্গে সাতকানিয়া ও আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও বন্যার কারণে আইপিএস, জেনারেটর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে।

কমিউনিটি ক্লিনিকে সাধারণত প্রাথমিক চিকিৎসা, গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। এসব সেবা বন্ধ বা সীমিত হয়ে যাওয়ায় গ্রামীণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।

এদিকে, চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি সরকারি ওষুধ সরবরাহেও দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ওষুধ সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে অনেক রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ সময়মতো পাচ্ছেন না।

আগে কমিউনিটি ক্লিনিকে ২৭ ধরনের ওষুধ দেওয়া হলেও বর্তমানে ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। সম্প্রতি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ যুক্ত করা হলেও সরবরাহ সংকটের কারণে রোগীরা সেই সুবিধাও নিয়মিত পাচ্ছেন না।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকৌশল বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কিছু সময় লাগবে। তবে ধাপে ধাপে সংস্কার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মোবাইল মেডিকেল টিম ও অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটও বিতরণ করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কমিউনিটি ক্লিনিক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা না হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা স্বাভাবিক করা কঠিন হবে।