বাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর, ২০ বছর পর মা-ছেলের স্মৃতি

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ
দুই দশক পর আবারও প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী। ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া বাঁশখালী সফর করেছিলেন। দীর্ঘ ২০ বছর পর একই আগস্ট মাসে তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাঁশখালী সফরে আসছেন। সময়ের ব্যবধান দুই দশক হলেও দুই সফরের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন।
২০০৬ সালের সেই সফর আজও বাঁশখালীর মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। সেদিন বাঁশখালী জলদী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ঢল নেমেছিল। দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রিয় নেত্রীকে একনজর দেখতে ছুটে এসেছিলেন। তৈলারদ্বীপ থেকে চাম্বল পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতিতে যানবাহন চলাচলও ব্যাহত হয়েছিল।
সেই সফরে তৈলারদ্বীপ সেতু, বাঁশখালী টেলিফোন এক্সচেঞ্জসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর উদ্বোধন করা হয়েছিল। তখন উপকূলীয় এই জনপদের মানুষের মধ্যে উন্নয়ন ও যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
দুই দশক পর বাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন সাম্প্রতিক বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পানিতে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু পরিবার। অনেকের ঘর আংশিক বা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে। অনেকে হারিয়েছেন গবাদিপশু ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন এলাকায় দুটি হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানস্থল, হেলিপ্যাড, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নির্মাণাধীন ঘর পরিদর্শন করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার মধ্যে বাঁশখালীও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার জেলে সম্প্রদায় এবং মাটির ঘরে বসবাসকারী অনেক পরিবার ক্ষতির শিকার হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য নতুন ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাঁশখালীর বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এখন দ্রুত পুনর্বাসন, ঘর নির্মাণ, কৃষি ও মৎস্য খাতে সহায়তার প্রত্যাশা করছেন। ঘর হারানো পরিবারগুলো নিরাপদ আশ্রয় চায়। কৃষকের প্রয়োজন নতুন করে চাষাবাদ শুরু করার সুযোগ। মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া চাষিরা চান পুনরায় ঘের তৈরির সহায়তা। পাশাপাশি উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও সড়কব্যবস্থার স্থায়ী উন্নয়নও স্থানীয়দের অন্যতম দাবি।
ছনুয়া, বড়ঘোনা, গন্ডামারা, সরল, খানখানাবাদ ও বাহারছড়ার উপকূলীয় এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, টেকসই বেড়িবাঁধ ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে প্রতিবছর দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
২০০৬ সালে একজন সংবাদকর্মী হিসেবে খালেদা জিয়ার বাঁশখালী সফর কাভার করার স্মৃতি এখনও জীবন্ত। দুই দশক পর একই জনপদে আবারও প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রত্যক্ষ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এবারের বাস্তবতা ভিন্ন। সেদিন ছিল জনতার উচ্ছ্বাস ও উন্নয়নের প্রত্যাশা; আজ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট ও পুনর্বাসনের আকুতি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে বাঁশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ আরও জোরদার হবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দ্রুত ঘর ফিরে পাবে, কৃষক ও মৎস্যচাষিরা আবারও নিজেদের জীবিকা শুরু করতে পারবেন এবং উপকূলীয় অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন হবে।
২০ বছর আগে মা এসেছিলেন বাঁশখালীতে। দুই দশক পর ছেলে আসছেন। সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে এই সফর তাই বাঁশখালীর মানুষের কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এটি নতুন প্রত্যাশারও প্রতীক হয়ে উঠেছে।








