কে এম ওবায়দুর রহমান: বাংলাদেশের রাজনীতির বর্ণাঢ্য এক অধ্যায়

মোঃ ইলিয়াছ খান (সালথা উপজেলা প্রতিনিধি) ফরিদপুর:
উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সাবেক মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধিকার আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৪০ সালের ৫ মে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কে এম ওবায়দুর রহমান। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও অধিকারভিত্তিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পর ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে কে এম ওবায়দুর রহমান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ফরিদপুর জেলা সমন্বয় ও প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন এবং সংগঠনের কাজে ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে যান এবং পুরুলিয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে তার নাম গুরুত্বপূর্ণভাবে স্মরণ করা হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।
১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত কে এম ওবায়দুর রহমান বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মৎস্য ও পশুসম্পদ এবং বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-২ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজ এলাকার মানুষের বিভিন্ন দাবি ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখেন।
২০০৭ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। পরে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মতপার্থক্য ও পরিবর্তন থাকলেও কে এম ওবায়দুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জাতীয় রাজনীতিতে অবদান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তার রাজনৈতিক জীবন নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাস জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিএনপিও বিভিন্ন সময়ে তার মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবং গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামী জাতীয় নেতা হিসেবে স্মরণ করে। ফরিদপুরের নগরকান্দার লস্করদিয়া গ্রামের এই কৃতী সন্তান বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থেকে যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভূমিকা রেখে গেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।








